(ছোট গল্প)
হানি ফ্রেন্ড শ্যামল সরকার
---- হ্যালো ---
--- ভাল আছিস অনির্বাণ ?
---- তুই এখন ! এত রাতে ! কোন সমস্যা ?
---- আরে না না । সময় পাই না তো সারাদিন । আজ তো রবিবার, চাপ একটু কম । আর এখনই মনে হল তোর কথা । সরি, একটু বেশী রাত হয়ে গেছে তোদের পক্ষে ! আসলে আমার তো সবে সন্ধ্যে ।
----- এখন সাড়ে বারোটা । এখন আর রবিবার নেই । অলরেডি সোমবার এসে গেছে অনেকক্ষণ । বল, কেন টেলিফোন করেছিস ।
----- আসলে আমি একটা কবিতা লিখলাম । এখনই । শুনবি ?
----- এত রাতে ঘুম ভাঙ্গিয়ে কবিতা ! বেশ, বল কী লিখেছিস ।
----- কথায় কথায় সব কিছুতে তোমরা অসম্ভব বল
অসম্ভবের গায়ে ভীষণ কটু গন্ধ লেগে থাকে
আমি সোনার থালায় সাজিয়ে রাখি ভালবাসা
আমার পিঠে হাত রাখে রাত্রির নীরবতা আর প্রবল অর্থাভাব
খিদের বালিশে আমি ঘুমোতে যাই
প্রতিদিন ঠিক ঘুম ভেঙ্গে যায় নিজস্ব বেলায় ------
------ কত লাগবে ?
------- এই, হাজার খানেক হলেই হবে ।
------- সকালবেলা অ্যাকাউন্ট চেক করিস ।
------ থ্যাঙ্ক ইউ মাই ডিয়ার । গুড নাইট ।
------ আর শোন, কবিতাটা ভালই হয়েছে । বাকিটা কাল শুনব । গুডনাইট ।
এককালের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু সুহাসের এমন টেলিফোন মাঝেমাঝে আসে অনির্বাণের কাছে, দিন-রাত যে কোন সময় । এবং প্রতিটিতেই কিছু আবদার থাকে । সুহাস বেকার, ভবঘুরে । অর্থ উপার্জনের জন্য কিছু করার দিকে কোন ঝোঁক নেই । কারন তার দাবী ওসব মেকানিক্যাল গেরস্তালি করার মতো ফালতু সময় তার নেই । তার নাকি লেখার জন্য অজস্র ফরমাস । সমাজের জন্য অনেক ভাবনাচিন্তা, গবেষণা । প্রকৃতপক্ষে দিনভর টোটো করে ঘুরে বেড়ানো, চায়ের স্টলে টেবিল গরম করা হাবিজাবি বক্তৃতা আর প্যাকেট প্যাকেট বিড়ির দহন কার্য ছাড়া আর কিছু করতে সুহাসকে দেখতে পায় না অনির্বাণ । তবু বন্ধুকে উপেক্ষা করতে পারে না । মনে একটা আশা পোষণ করে ---- ওর মতো আশ্চর্য্য মেধাবী ছেলে নিশ্চয়ই কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে বড়ো কিছু করে সবাইকে চমকে দেবে একদিন ।
অনির্বাণ স্বচ্ছল । একটি উচ্চ মাধ্যামিক স্কুলের শিক্ষক সে । তার স্ত্রী মধুমিতাও একটি উচ্চ মাধ্যামিক স্কুলের শিক্ষিকা । সাজানো-গোছানো বাড়ী । একটি ছেলে ---- স্বপ্নলোক । সে কলেজে পড়ে ---- দিল্লিতে । নির্ঝঞ্ঝাট সংসার । পুরানো বন্ধু সুহাসকে নিয়ে কোন দায়িত্ব নেবার কোন ইচ্ছে তার না থাকলেও মাঝে মাঝে করা ওর উৎপাতকে এড়িয়ে যেতে পারে না সে । যদিও এসব নিয়ে মধুমিতার তাচ্ছিল্যের শেষ নেই ।
কলেজে একসাথে পড়ত অনির্বাণ, সুহাস, মধুমিতা । ইংরেজিতে অনার্স । অনির্বাণ প্রবল পড়ুয়া । রাতদিন পড়ে পাতার পর পাতা নোট মুখস্ত করত । আর পরীক্ষায় হুবহু সেসব লিখে কাড়ি কাড়ি নম্বর হাসিল করত । আর সুহাসের মাথায় কিলবিল করত দেশবিদেশের ক্লাসিক লিটারেচার । সিলেবাসের সংকীর্ণ গণ্ডিতে সে বাঁধা পড়তে চাইত না কিছুতেই । ক্লাসে স্যারের সাথে কথা বলতে কথা বলতে গিয়ে এমন অপ্রচলিত সাহিত্য কর্ম নিয়ে কথা বলত, মুগ্ধ হত সবাই । কেবল বিরক্ত হতেন স্যার । ক্লাস নেবার সমস্ত প্রস্তুতি লন্ডভন্ড হয়ে যেত সিলেবাসের বাইরের বিষয়ের ধাক্কায় । স্যার এর পর শুধু ক্লাস ব্যাঙ্ক করতেন । এড়িয়ে যেতেন ব্যাচটাকে । পরীক্ষার ফল বেরোলে অনির্বাণের যখন অনির্বচনীয় সাফল্য ঝলমল করত, সুহাস তখন মুক্ত আকাশের কোথায় হারিয়ে যেত খুঁজে পাওয়া যেত না এতটুকু । অগত্যা একদিন কলেজ ছেড়েছিল বাউন্ডুলে সুহাস, ছেড়েছিল মধুমিতা সহ আরও অনেক সহপাঠিনীর হ্রদয় সিংহাসন । আজ মধুমিতা অনির্বাণের ঘরণী । সুহাসের প্রতি কি যেন এক তীব্র ক্ষোভ, অভিমান নাকি ঘৃণা নিজেই বুঝতে পারে না সে ।
মধুমিতা চুপ করে ছিল এতক্ষণ । অনির্বাণ ঘুমিয়ে পড়লেও সে তখন শোবার আগের প্রসাধন সারছিল ঢাউস আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে । অনির্বাণ টেলিফোন কাটতেই কোমরে দু’হাত রেখে একটু বাঁকা হয়ে দাঁড়াল অনির্বাণের চোখে সোজাসুজি চোখ রেখে । অনির্বাণের চোখ স্ত্রীর নতুন কেনা প্রায় স্বচ্ছ গাউনের ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া নিটোল শরীরটার দিকে । মধুমিতা চাপা গলায় হুংকার দিল ----- অলস, অপদার্থ ভিখারীটার টেলিফোনটা রিসিভ করলে কেন এত রাতে ! এক পয়সা আর দেবে না কখনো ওকে বলে দিলাম ।
----- অনির্বাণ শীতল । বলল ---- ও এ সময় টেলিফোন না করলে তো ঘুমিয়েই থাকতাম । তোমার এই অপরূপ রূপটা দেখতে পেতাম না । আই এ্যাম ট্রুলি ফর্চুনেট টু এনজয় দ্যা বিউটি অব মিডনাইট সান ইন মাই বেডরুম । প্লিজ কাম এন্ড এনলাইটেন মি মাই ডিয়ার । অনির্বাণ দু’হাত বাড়িয়ে দিল । মধুমিতার রাগ অভিমান কোথায় যে মিলিয়ে গেল ফুড়ুৎ করে, সে মিশে গেল অনির্বাণের শরীরে, যেন শরতের আকাশে দু’খণ্ড নরম সাদা মেঘের লীন হয়ে যাওয়া পবিত্র নীলিমায় ।
পরদিন সকালে মধুমিতা সরাসরি জিজ্ঞেস করল অনির্বাণকে ----- তুমি সুহাসকে টাকা পাঠিয়েছ, না ?
অনির্বাণ চুপ মেরে আছে হাতের ইংরেজি পত্রিকাটা হাতে নিয়ে শূণ্য দৃষ্টি মেলে রেখেছ জানালায় উঁকি মারা প্রভাতী আকাশে । মধুমিতা আরও রেগে গেল হাজব্যান্ডের নীরবতায় । গর্জে উঠল এবার ----- চুপ থেকো না, কথা বল । অনির্বাণ হাতের পত্রিকাটা বাড়িয়ে দিল স্ত্রীর দিকে ।
মুখে কোন কথা নেই । মধুমিতা প্রবল অনিচ্ছা ভরে পত্রিকাটা হাতে নিতেই অনির্বাণ সামনের জুড়োতে থাকা চায়ের কাপটায় চুমুক দিল একটা বেশ গভীর করে । একটা হালকা শব্দ হল তাতে । আড় চোখে তাকিয়ে দেখল ---- পুবের জানালা দিয়ে আসা এক চিলতে রোদ হামলে পড়েছে মধুমিতার মুখ মণ্ডলে । মধুমিতা পত্রিকার প্রতিবেদনটা পড়ছে । ক্রমশঃ বিস্ফারিত হচ্ছে তার চোখ । ফরসা মুখমণ্ডলে রক্ত জমছে । সে নিবিড় ভাবে পড়ছে পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত একটি অসামান্য বই ‘ড্রিম ডেজ’-এর রিভিউ । বইটি লিখেছেন ভারতীয় লেখক ---- সুহাস চক্রবর্তী । বইটির লক্ষ কপি নিমেষে উধাও । পর পর নতুন সংস্করণ হচ্ছে । বইটি নিয়ে হৈ হৈ পড়েছে পৃথিবীর তাবৎ বিদগ্ধ কূলে । বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরষ্কারের জন্য নমিনেশনও পেয়েছে ড্রিম ডেজ । অনির্বাণ অপেক্ষা করছে মধুমিতা কখন প্রতিবেদনের শেষ লাইনটি পড়বে । শেষ লাইনে আছে ---- লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তার প্রিয়তম বন্ধুকে এভাবে ----- ‘ডেডিকেটেড টু মাই সুইটেস্ট হানি ফ্রেন্ড’ । বুদ্ধিমতী মধুমিতার ‘হানি-ফ্রেন্ড’ কথার অর্থ বুঝতে অসুবিধা হল না । সে ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখল কাগজটি । তারপর ঢুকে গেল নিজের ঘরে । চার পাশে তখন এক গভীর স্তব্ধতা । সময় যেন থেমে গেছে । সে আর বেরোল না দীর্ঘক্ষণ । অনির্বানের চোখ ফিরে গেছে আকাশের নীলে ।
শ্যামল সরকার
Comments
Post a Comment